শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

আমাদের স্বপ্নগুলো কেনো মরে যায়

জাকির আবু জাফর

মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা স্বপ্নের মধ্যে বাস করে। বচনটি আবুল ফজলের ন্যান্সি টার্নার নামে একজন সমাজ বিজ্ঞানীর ভাষ্য- আমরা যদি স্বপ্ন না দেখতাম, তাহলে জীবন অসহ্য হয়ে উঠতো।

দুটো বচনই গুরুত্বপূর্ণ! দুটো বচনই স্বপ্নের সঙ্গে জীবনের ঘনিষ্ঠতার কথা বলে। জীবনের জন্য স্বপ্ন বেশ প্রয়োজন। জীবনকে জাগিয়ে রাখার রসদ হিসেবে স্বপ্ন কাজ করে খুব। তাই স্বপ্ন নিয়ে বিবেচনার দাবি রাখে।

স্বপ্ন কি? স্বপ্ন হলো আশা জাগিয়ে রাখার একটি অনুভূতি! স্বপ্ন, দুঃখ সহ্য করার একটি উপায়। এবং স্বপ্ন খারাপ অবস্থা থেকে ভালো অবস্থানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি উপলক্ষ।

বিষয়টি আরও খোলাসা করে বললে বলতে হয়- প্রতিটি মানুষের বর্তমান যদি দুঃসহ হয়ে ওঠে, যদি চলমান সময়টি কষ্ট এবং হতাশার হয় তবে খুব সহসা ভালো সময় আসবে। সুখের সময় আসবে এবং দুঃসময় কেটে যাবে। এমন আশা এবং সম্ভাবনা মনে জাগিয়ে রাখাই স্বপ্ন।আরও সাদা করে বলি- আজ যে অবহেলিত কাল সে মূল্যবান হবে এমন আশাই স্বপ্ন। আজ গুরুত্বপূর্ণহীন একদিন সেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে - এমন কল্পনাই স্বপ্ন।

আজ গণতন্ত্র নেই, কাল গণতন্ত্র ফিরবে! আজ মানবাধিকার নেই, সহসা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে - এমন আশার জ্যোতিই স্বপ্ন। দুঃশাসন থেকে সুশাসনে ফেরার আশাই স্বপ্ন!

তো প্রতিটি মানুষের মনের দেশে স্বপ্নের চাঁদ উদিত হয়। প্রতিটি মানুষই তার জায়গা থেকে আশার বীজ বোনে। ভাবে তার বীজ থেকে অঙ্কুরিত হবে চারা। সেই চারাটিই বৃক্ষ হবে একদিন। সে বৃক্ষটি হয় সুমিষ্ট ফল দেবে। নয় ফুল ফুটিয়ে সৌরভ ঢালবে। নয়তো ডালপালা ছড়িয়ে অন্তত ছায়া দেবে।

এমন করেই স্বপ্ন দেখে মানুষ। দেখে আরও কোনো সুন্দর সময়ের অপেক্ষায়। আরও কোনো ভালো অবস্থানের আশায়। আরও কোনো উন্নত ব্যবস্থার তৃষ্ণায়।

আমরা কত কত স্বপ্ন দেখেছি। দেখছি। হয়তো দেখতে থাকবো আরও। যেমন দেখছে এদেশের কোটি কোটি জনতা। দেখছে বিশ্বের নির্যাতিত মানুষ। যাদের অধিকার লুট হয়ে গেছে। যাদের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। যারা প্রতিহিংসার শিকার। অকারণ অবিচারে নিষ্পেষিত। তারাই মুক্তির স্বপ্ন বুনছে।

মানুষ কেনো মানুষকে ঘৃণা করে!  কেনো মানুষ হয়ে ওঠে মানুষের শত্রু। কেনো মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় ভয়! কী করে অন্যায়ভাবে মানুষের ওপর নির্যাতন করে মানুষ। কী করে মানুষ কেড়ে নেয় মানুষের অধিকার! কী করে!

গোটা দুনিয়ায় নিপীড়িত মানুষের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। আমরা বলছি- ক্রমাগত আধুনিক হচ্ছি আমরা! হ্যা হচ্ছিইতো! না হলে মানুষ মারার জন্য আণবিক বোমা তৈরি হতো কেমন করে! আণবিক বোমার মালিকেরা একটি কালো ব্যাগে সেই  বোমার বোতাম নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন কী করে!

এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে মিসাইল ছোঁড়ার আয়োজন কী হতো! জঙ্গি বিমান থেকে ফসফরাস বোমা ঢালেন কেমন করে!  এসবই তো আধুনিকতার ছবি।

মানুষ আধুনিক হয়েছে। সেই সাথে আধুনিক হয়েছে মানুষের ওপর মানুষের নির্যাতনের ধরন।

নির্যাতন অতীতে দেখেছে মানুষ। এখনও দেখছে! ভবিষ্যতেও দেখবে। পৃথিবীতে শক্তির পুজারীরা অসহায় মানুষের পক্ষে দাঁড়ায় না কখনও। ক্ষমতাবানদের সঙ্গেই থাকেন ক্ষমতাবানেরা। যার কিছু নেই তাকে আরও নিঃস্ব করে দাও, এমনই যেনো শক্তিমানদের চাওয়া। তাই যেখানে নিপীড়িত মানুষেরা প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে, সেখানেই অত্যাচার নির্যাতন বেড়েছে। যেখানে বঞ্চিতরা নিজেদের অধিকারের বিষয়ে সোচ্চার হয়েছে, সেখানেই তারা বঞ্চনার শিকার হয়েছে।

এতকিছুর পরও স্বপ্ন দেখে মানুষ! তবুও স্বপ্ন জাগিয়ে রাখে বুকের তলায়। তবুও আশা করে মুক্তির। ভাবে- সকল আঁধার ঠেলে উঠে আসবে নতুন সূর্যের দিন। এ আশায় লড়াই করে মানুষ। সংগ্রাম করে। প্রতিবাদ প্রতিরোধ করে।

এইযে স্বপ্ন মানুষের! কী সেই স্বপ্ন!  সেই স্বপ্ন হলো- একটি মানবিক সমাজ নির্মাণের। একটি মানবাধিকার রক্ষার আয়োজনের। এমন সমাজের যেখানে মানুষ অন্তত: তার ইচ্ছের বাস্তবায়ন করতে কোনো বাধায় আটকাবে না।

মানুষ স্বপ্ন দেখে একটি গণতান্ত্রিক সমাজের। নিজেদের নেতা নিজেরা নির্বাচন করে সমাজকে এগিয়ে নেবার! ‘আমার ভোট আমি দেবো, তোমার ভোটও আমি দেবো’ র কোনো চাওয়া নয়। বরং যাকে ইচ্ছে তাকে ভোট দেবার স্বাধীনতাই কামনা করে মানুষ। যেমন আমরা করছি। এটুকু কি খুব বড় চাওয়া! আধুনিক সভ্যতা তবে কি! জবরদস্তি করে লক্ষ্য হাসিল তো বন্য সমাজের হতে পারে। আধুনিক সমাজের হয় কী করে!

একটি গণতান্ত্রিক সমাজ বা দেশ এখন খুব সামান্য চাওয়া! এখন বড় চাওয়া হলো- আমার দেশ অর্থনীতিতে পৃথিবীর সুপার পাওয়ার হবে। প্রযুক্তি-বিজ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে। একজনও বেকার থাকবে না। শিক্ষা দীক্ষায় প্রথম শ্রেণির হবে। কোনো পরাশক্তি আমাদের ওপর চোখ তোলার সাহস করবে না। হ্যা এসব বড় চাওয়া কঠিনই বটে।

তাই একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চাওয়ার গল্পটি খুব অল্প নয় কি! হ্যা এই অল্পটুকুই এদেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বপ্ন! না, বর্তমানে শুধু নয়। অতীত থেকেই। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এদেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার বুঝে পেতে। নিজের অধিকার ফিরে পেতে। সেই আগুন ঝরা একাত্তরের কথা আমরা ভুলবো কেনো! কিন্তু মনেও কি রেখেছি!  নাহ্ রাখিনি। আমরা মুখে যা বলি তা করি না। যা করি তা বলি না। অথচ মানুষ হিসেবে আমাদের উচিৎ যা বলি তা-ই করা। কিন্তু আমরা দিব্যি উল্টোটি করে নিজেদের সভ্য দাবি করছি।

একটি মূল্যবোধ সম্পন্ন সমাজের স্বপ্ন দেখা কি অপরাধ! ঐতিহ্যেধারী সমাজ চাওয়া কি অনুচিত! নিশ্চয় না। তবে?  তবে আর কি আমরা এসব চাইবো। এসব স্বপ্ন দেখবো!

এ স্বপ্ন কি নতুন? -না নতুন নয়! একদম পুরনো। মানুষের আদি থেকেই এ স্বপ্নের সূচনা। কাল থেকে কালান্তরে বেড়েছে এ স্বপ্নের পরিধি। যুগ থেকে যুগান্তরে প্রসারিত হয়েছে এর সীমানা। সময় থেকে সময়ান্তরে হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা যারা একটি সবুজ শ্যামল বাংলাদেশের ভূগোলে বসত করি আমাদের স্বপ্নটি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে।

কেনো? কারণ আমরা বরাবর এই স্বপ্নটি বুকে চেপে পথ চলি। কখনও কখনও স্বপ্নটি আমাদের উত্তেজনা চাগিয়ে দেয়। মনে হয় আমাদের স্বপ্নের নাওটি খুব সহসা ভিড়বে কূলে। মনে হয় আমাদের স্বপ্নের গন্তব্য খুব নিকটে। কিন্তু না দেখতে দেখতে নাওটি মাঝ দরিয়ায় সরে যায়। হঠাৎ ঝড়ের তা-বে ভেঙে যায় গণতন্ত্রের মাস্তুল! ফলে গন্তব্য হয়ে যায় আরও আরও বহুদূর! 

কিন্তু কেনো? কেনো আমাদের স্বপ্নের পাখিটি অধরা থেকে যায়। কেনো আমাদের গন্তব্য দূর হয়ে ওঠে। স্বপ্নের তরীটি কূলে ভেড়াতে পারি না কেনো! কোথায় আমাদের সমস্যা! কোথায় আমরা পরাজিত! কেনো পরাজিত!

আমাদের স্বপ্ন কি অসম্ভব কিছু!  তাও তো নয়। মানুষ হিসেবে আমরা আমাদের ন্যূনতম অধিকার আশা করতেই পারি। এমন একটি সমাজ চাইতেই পারি- যেখানে থাকবে আমাদের ন্যূনতম অধিকার। থাকবে শিক্ষা চিকিৎসা ও মুক্তভাবে বসবাসের সুযোগ। ভাতের অধিকার যেমন থাকবে। তেমনই থাকবে ভোটের অধিকার। আমি আমার পছন্দের নেতা নির্বাচন করার অধিকার নিশ্চয় আমি রাখি। যিনি আমার শাসক হবেন। আমাকে শাসন করবেন। তাকে কেনো আমি বেছে নেবো না! কেনো নিতে পারবো না! এমন সুযোগ আমার থাকবে না কেনো!

সময়টি তো আধুনিক। ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতার ছোঁয়া সর্বত্র। আধুনিক সকল সুযোগ সুবিধা নিচ্ছে মানুষ। গ্রহণ করছে অহরহ। এমন আধুনিক যুগে একজন আরেকজনের অধিকার লুট করবে এটি কি ভাবা যায়! 

গোট পৃথিবী এখন মুক্তবাজর অর্থনীতির ঢেউয়ে উথাল পাতাল। পরিবারে ছেলেমেয়েরাও অতি অল্প বয়সে স্বাধীনতার বুলি আওড়ায়। সেখানে সমাজ বা রাষ্ট্রে নাগরিক স্বাধীনতা থাকবে না এটি মানা যায়!  গণতান্ত্রিক সুযোগ রহিত হবে এটি ভাবা যায়!  জবরদস্তির খেলা চলতেই থাকবে, এটি কী করে চিন্তা করা যায়!

আমাদের অপরাধটি কোথায়!  আমাদের সমস্যাই বা কোথায়!  আমরা কি তবে জাতি হিসেবে এখনও আধুনিক নই! এখনও তেমন করে সভ্য হয়ে উঠিনি! কিংবা নিদেন পক্ষে ন্যূনতম শিক্ষিত হতে পারিনি!

অন্যের অধিকার লুণ্ঠনকে একজন শিক্ষিত মানুষ ঘৃণা করার কথা! অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে হস্তগত করা নিকৃষ্টতায় লজ্জিত হওয়ার কথা। অবৈধ উপায়ে রাষ্ট্রের সম্পদ লুট করা ঘৃণিত কাজ হওয়ার কথা। অন্যের অসুবিধার কারণ হওয়াকে অসংস্কৃত ভাববার কথা। অন্যকে হীন বা খাটো করলে নিজে আরও খাটো এবং হীনতর হয় সে কথা মনে জাগিয়ে চলার কথা। অথচ আমরা কত সহজে এসব অসুন্দর কাজ করে গর্ববোধ করতে পারি! ইস এ-ও দেখতে হয় আমাদের!

তবে এটিও সত্যি, যারা সুস্থতার স্বপ্ন দেখেন তারা তাদের স্বপ্নে অটল থাকেন না। অথবা যা মুখে বলেন তা মনে দৃঢতার সঙ্গে পোষণ করেন না। আসলে চিন্তা কথা ও কাজ যদি এক রেখায় না দাঁড়ায় তবে স্বপ্ন কখনও সফল হয় না। হবেও না। বিশ্বাসের সাথে উচ্চারিত হবে কথা। আর কথা অনুযায়ী হবে কাজ। তবেই স্বপ্ন রূপ নেবে বাস্তবতায়। যদিও সময় বেশি লাগবে কিছুটা। লাগুক। তবুও বেঁচে থাক আমাদের স্বপ্নগুলো। মনে রাখতে হবে- স্বপ্ন মরে গেলে আর কিছুই বেঁচে থাকে না!

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ